মানুষের স্বভাব কীভাবে তৈরি হয়?

চৌদ্দ শতকের মুসলিম মনীষী ইবনে খালদুন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'মুকাদ্দিমা'-তে একটি অসাধারণ প্রশ্ন তুলেছেন: মানুষের চরিত্র, বুদ্ধি আর সমাজ কীভাবে গড়ে ওঠে? তাঁর উত্তর ছিল অনেকটা এরকম — একটি জাতি কোথায় বাস করে, কী খায় এবং কতটা আধ্যাত্মিকভাবে শুদ্ধ — এই তিনটি বিষয় মিলেই তার স্বভাব তৈরি হয়। এই লেখায় সেই ভাবনাগুলো সহজ ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে।

বিশেষ প্রবন্ধইতিহাসরাজনীতি, সরকার এবং প্রশাসনসমাজসংস্কৃতিশিক্ষাযুদ্ধবিশ্ব

Abdur Sami

5/17/20261 min read

a white plate topped with a sandwich and french fries
a white plate topped with a sandwich and french fries

১. আবহাওয়া কীভাবে মানুষের স্বভাব বদলে দেয়

ইবনে খালদুন পুরো পৃথিবীকে সাতটি জলবায়ু-অঞ্চলে ভাগ করেছিলেন। তাঁর মতে, একজন মানুষ কোন অঞ্চলে জন্মায় ও বড় হয়, সেটিই তার মেজাজ ও চরিত্রের মূল কারণ। কারণ গরম বা ঠান্ডা আবহাওয়া মানুষের ভেতরের 'প্রাণশক্তি'-কে সরাসরি প্রভাবিত করে।

গরম, ঠান্ডা ও মাঝারি আবহাওয়া — তিনটি আলাদা স্বভাব

বাতাসের ধরন ও মানুষের মন

শুধু গরম-ঠান্ডা নয়, বাতাস কতটা হালকা বা ভারী সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।

হালকা বাতাসে মানুষ চটপটে ও মিশুক হয়, কিন্তু গভীর ভাবনায় কম মনোযোগ দেয়।

ভারী বা স্যাঁতসেঁতে বাতাসে মানুষ ধীরস্থির ও সতর্ক হয়, কিন্তু মনে একটা ভার থাকে।

মাঝারি ও স্বাস্থ্যকর বাতাসে মানুষের মন ও মেধা দুটোই সঠিকভাবে বিকশিত হয়। এই অঞ্চলেই সভ্যতার সবচেয়ে বড় বিকাশ ঘটেছে।

গায়ের রঙ ও শরীরের গড়ন — এগুলো জাতিগত নয়, পরিবেশের ফল

ইবনে খালদুন স্পষ্টভাবে বলেছেন, কালো বা সাদা ত্বক কোনো জাতির 'স্থায়ী বৈশিষ্ট্য' নয়। এটি সূর্যের কাছে-দূরে থাকার কারণে হয়। যে অঞ্চলে সূর্য তীব্র, সেখানকার মানুষের ত্বক গাঢ় হয় ও চুল কোঁকড়ায়। যেখানে সূর্য দুর্বল, সেখানে ত্বক ফর্সা হয়। মাঝারি অঞ্চলের মানুষেরা শারীরিক দিক থেকে সবচেয়ে সুষম হয়, এবং তাই তারা সভ্যতা গড়তে সবচেয়ে বেশি সক্ষম।

২. কী খাচ্ছেন তার উপর নির্ভর করে আপনার মন কতটা তীক্ষ্ণ হবে

আবহাওয়ার পরে আসে খাদ্যাভ্যাসের প্রশ্ন। ইবনে খালদুন এখানে একটি মজার কথা বলেছেন — যে দেশ যত বেশি উর্বর ও খাদ্যসমৃদ্ধ, সেই দেশের মানুষ তত বেশি অলস ও বুদ্ধিতে মোটা হয়ে পড়ে! অপরদিকে, যারা কম খেয়ে কষ্টে জীবন কাটায়, তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়।

ভালো খাবার কি ক্ষতিকর? ইবনে খালদুনের ব্যাখ্যা

তিনি বলেছেন — গম, ভালো মাংস ও তৈলাক্ত খাবার পেটে 'ভারী বাষ্প' তৈরি করে। সেই বাষ্প মাথায় উঠে মস্তিষ্ককে ঢেকে ফেলে। ফলে বুদ্ধি ধীর হয়, শরীর নরম হয় এবং মানুষ আরাম-প্রিয় হয়ে পড়ে। মরুভূমির বেদুইনরা যারা শুধু বার্লি, দুধ ও চর্বিহীন মাংস খায়, তারা এই 'ভারী বাষ্প' থেকে মুক্ত। তাই তাদের মাথা পরিষ্কার, শরীর শক্ত এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি।

বিলাসিতা কীভাবে একটি জাতিকে ধ্বংস করে — তিনটি ধাপ

ইবনে খালদুন দেখিয়েছেন, বিলাসিতা ধীরে ধীরে একটি জাতির ঐক্য ও শক্তি নষ্ট করে দেয়:

1. প্রথম ধাপ: মানুষ প্রয়োজনীয় জিনিসের বাইরে অতিরিক্ত ভোগ শুরু করে। ভালো খাবার মস্তিষ্ককে ধীর করে দেয় এবং শরীরকে নরম করে।

2. দ্বিতীয় ধাপ: বিলাসিতা অভ্যাসে পরিণত হলে মানুষ রাষ্ট্রের সুরক্ষার উপর নির্ভর করতে শুরু করে। নিজে লড়াই করার মনোবল ও ক্ষমতা হারিয়ে যায়।

3. তৃতীয় ধাপ: রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মরুভূমি বা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা কঠোর জীবনযাপনে অভ্যস্ত, ক্ষুধার্ত ও উদ্যমী একটি দল তাদের উৎখাত করে।

অর্থাৎ, শরীরের কৃশতা আত্মার শক্তির পূর্বশর্ত। যার শরীর যত বেশি পার্থিব ভোগ থেকে মুক্ত, তার আত্মা তত বেশি উপরের দিকে উঠতে পারে।

৩. মানুষের উপলব্ধি কতটা গভীর হতে পারে — তিনটি স্তর

ইবনে খালদুন মানুষের জ্ঞান ও উপলব্ধিকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন। কার আত্মা কতটা 'পরিষ্কার' ও পার্থিব বাঁধন থেকে মুক্ত, তার উপর নির্ভর করে সে কতটা গভীর জ্ঞান পেতে পারে।

স্তর ১: সাধারণ মানুষ

আমরা বেশিরভাগই এই স্তরে। আমরা যা চোখে দেখি, কানে শুনি, হাতে ছুঁই — তার ভিত্তিতে জানি। আমাদের জ্ঞান পর্যবেক্ষণ ও পড়াশোনার মাধ্যমে আসে এবং এই দুনিয়ার বাইরে সরাসরি কিছু দেখতে পাই না।

স্তর ২: আউলিয়া বা বুজুর্গ ব্যক্তিরা

এই মানুষেরা দুনিয়ার মোহ থেকে অনেকটাই মুক্ত। সংযমী জীবনযাপন ও আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে তাদের আত্মা এমন একটি জায়গায় পৌঁছায় যেখানে তারা সাধারণ ইন্দ্রিয়ের বাইরের কিছু অনুভব করতে পারেন — যাকে বলা হয় 'কাশফ' বা অন্তর্দৃষ্টি। এই জ্ঞান যুক্তির ধাপে ধাপে আসে না, সরাসরি মনে আলো জ্বলে ওঠে।

স্তর ৩: নবী-রাসূলগণ

এটি সর্বোচ্চ স্তর। নবীগণ সম্পূর্ণভাবে মানবীয় সীমা অতিক্রম করে ফেরেশতার চেতনায় পৌঁছাতে পারতেন — যদিও মুহূর্তের জন্য। সেই মুহূর্তে আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী বা প্রত্যাদেশ আসত। তারপর আবার মানবীয় অবস্থায় ফিরে এসে সেই বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতেন।

ওহী হলো একজন মানুষের আত্মার মানবীয় অবস্থা থেকে ফেরেশতার অবস্থায় যাওয়া — মাত্র একটি মুহূর্তের জন্য। সেই মুহূর্তে সে ফেরেশতার জগতের অংশ হয়ে পড়ে। তারপর আবার মানুষের অবস্থায় ফিরে এসে যা পেয়েছে তা বলে।

এই নবুওয়াতের জ্ঞানই মানব ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এনেছে — ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা গোষ্ঠীগুলোকে একত্রিত করে বড় সভ্যতা গড়ে তুলেছে।

কাশফ বা আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টি কী?

এটি এমন একটি উপলব্ধি যা ঘণ্টার পর ঘণ্টা চিন্তা না করেই সরাসরি মনে আসে।

এটি মানবীয় ও আধ্যাত্মিক জগতের সীমারেখায় কাজ করে।

এটি নতুন আইন দেয় না, বরং বিদ্যমান সত্যগুলোকে ভেতর থেকে বুঝিয়ে দেয়।

৪. স্বপ্ন — অদেখা জগতের সাথে আত্মার সংযোগ

ইবনে খালদুন স্বপ্নকে হেলাফেলার বিষয় মনে করেননি। তাঁর মতে, ঘুমের মধ্যে আত্মা বাইরের ইন্দ্রিয়ের বাধা থেকে মুক্ত হয় এবং অনেক সময় এমন কিছু দেখতে পায় যা জাগ্রত অবস্থায় সম্ভব নয়।

তিন ধরনের স্বপ্ন

4. সত্য স্বপ্ন (রুইয়া): এই স্বপ্নগুলো সরাসরি 'লওহে মাহফুজ' বা আল্লাহর সংরক্ষিত জ্ঞানভাণ্ডার থেকে আসে। এগুলো সাধারণত ছোট, স্পষ্ট এবং ঘুম ভাঙার ঠিক আগে দেখা যায়।

5. বিভ্রান্তিকর স্বপ্ন: এগুলো আমাদের মনের ভেতরের চিন্তা বা পেটের কারণে হয়। লম্বা, এলোমেলো এবং কোনো বিশেষ অর্থ বহন করে না।

6. শয়তানি স্বপ্ন: ভয় বা কষ্ট দেওয়ার জন্য। এগুলোতে বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা থাকে।

মানুষের জ্ঞান ও ফেরেশতার জ্ঞান — পার্থক্য কোথায়?

ঘুমের মধ্যে আত্মা কীভাবে উঁকি দেয়?

ইবনে খালদুন বলেছেন, ঘুমের সময় আত্মা বাইরের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে ভেতরের দিকে মনোযোগ দেয়। যদি পেট হালকা থাকে — অতিরিক্ত খাওয়ার 'ভারী বাষ্প' না থাকে — তাহলে আত্মা আধ্যাত্মিক জগতের দরজায় একটু উঁকি দিতে পারে। সেখান থেকে ভবিষ্যতের কোনো ঘটনা বা গোপন সত্য দেখতে পায়, যা জেগে উঠলে সত্য স্বপ্ন হিসেবে মনে থাকে। এই কারণেই ইসলামি ঐতিহ্যে খাওয়ার আগে ঘুমানো বা হালকা পেটে রাতের ইবাদতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

৫. সব কিছু মিলিয়ে ইবনে খালদুন কী বলতে চেয়েছেন?

ইবনে খালদুনের ভাবনাকে একটি সহজ সূত্রে বলা যায়:

যে মাটিতে জন্মাও সেটি তোমার মেজাজ তৈরি করে। যা খাও সেটি তোমার বুদ্ধি তৈরি করে। আর যতটা পার্থিব বন্ধন থেকে মুক্ত হও, ততটা আধ্যাত্মিকভাবে উপরে উঠতে পারো।

আফ্রিকার গরম অঞ্চলের মানুষের হাসিখুশি স্বভাব বা ইউরোপের ঠান্ডা অঞ্চলের মানুষের গম্ভীরতা — এটি কোনো 'দোষ' বা 'গুণ' নয়, এটি পরিবেশের স্বাভাবিক ফল। একইভাবে, যে বেশি খায় সে কম বোঝে — এটি শুধু নৈতিক উপদেশ নয়, ইবনে খালদুন এটিকে একটি শারীরিক বাস্তবতা হিসেবে দেখেছেন।

আর স্বপ্ন থেকে শুরু করে নবুওয়াত পর্যন্ত — সব ক্ষেত্রেই মূল কথা একটাই: যত পরিষ্কার আত্মা, তত গভীর জ্ঞান। বস্তুজগৎ ও আধ্যাত্মিক জগৎ একে অপরের সাথে জড়িত। ইবনে খালদুন মনে করতেন, এই দুটো জগতকে আলাদা করে ভাবলে মানব সভ্যতার পুরো ছবি কখনো পরিষ্কার হবে না।